মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ পূর্বাহ্ন

Headline :
বিআইডব্লিউটিএ-এ ড্রেজিং বিভাগে মেগা দুর্নীতিঃ ন্দী খননের নামে শ্ত কোটী টাকা লুটপাট গণপূর্তে আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ, তদন্ত চেয়ে দুদকে আবেদন ইরানে সামরিক উত্তেজনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের ১১ দেশে মার্কিন সতর্কতা জারি মেসির অবসরে আবেগঘন শ্রদ্ধা জানালেন বাংলাদেশের জাতীয় দলের ফুটবলাররা সিএসএসে ১৫০ লোন অফিসার নিয়োগ, সরাসরি পরীক্ষার সুযোগ নতুন পে-স্কেলে মূল্যস্ফীতি ও অর্থায়নের চ্যালেঞ্জ দেখছেন অর্থনীতিবিদরা হিমালয়ের দুর্যোগ মোকাবিলায় বৈশ্বিক দায়িত্বের আহ্বান শাহর গুলশানের ফ্ল্যাট মামলায় টিউলিপের অভিযোগ গঠনের শুনানি ১১ জানুয়ারি লোডশেডিং কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দেড়-দুই বছরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ বিপিএল স্থগিতের সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদী সুফলের জন্য ক্রিকেটারদের বড় ত্যাগ

ধামরাইয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বিভ্রাট: চরম ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা

Reporter Name / ৮ Time View
Update Time : মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ পূর্বাহ্ন

ঢাকার ধামরাই উপজেলার ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সোমবার (১৭ আগস্ট) একযোগে দ্বিতীয় টার্মিনাল মূল্যায়ন পরীক্ষা শুরু হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার প্রথম দিনেই ইংরেজি বিষয়ের প্রশ্নপত্র নিয়ে নানা ধরনের অসংগতি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় প্রশ্নপত্র কম সরবরাহ করা হয়েছে, আবার কোথাও এক শ্রেণির প্রশ্নের প্যাকেটের ভেতর পাওয়া গেছে অন্য শ্রেণির প্রশ্ন। এছাড়া অনেক প্যাকেটে প্রশ্নপত্রের অংশবিশেষ ছাপা না থাকায় শিক্ষার্থীরা চরম বিভ্রান্তিতে পড়ে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক বিদ্যালয়ে পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে শুরু করা সম্ভব হয়নি এবং শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্রের এই ঘাটতি ও ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন ছয়টি কম ছিল। অন্য কয়েকটি বিদ্যালয়ে একই শ্রেণির প্রশ্ন যথাক্রমে পাঁচটি, সাতটি ও ১৭টি পর্যন্ত কম পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভাড়ারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণির প্রশ্নের প্যাকেটে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির প্যাকেটের ভেতর প্রথম শ্রেণির বাংলা প্রশ্ন পাওয়া গেছে। ওই বিদ্যালয়টিতে প্রথম শ্রেণিতে ২২ জন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৪২ জন শিক্ষার্থী ছিল, যেখানে দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্নপত্রের ঘাটতি ছিল ২০টি।

চন্দ্রপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও একই ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। সেখানে চতুর্থ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের প্যাকেট খোলা হলে ভেতরে বাংলা বিষয়ের প্রশ্ন পাওয়া যায় এবং সেখানেও প্রশ্নপত্রের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল। প্রশ্নপত্রের এই ঘাটতি মেটাতে অনেক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ফটোকপি করার উদ্যোগ নিতে হয়। এই প্রক্রিয়ার সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে আলাদা কক্ষে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে। একটি বিদ্যালয়ে ১৭ জন শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্রের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে, যা কোমলমতি শিশুদের মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষকদের ভাষ্যমতে, শুধু প্রশ্নের সংখ্যা কম বা প্যাকেট অদলবদল হওয়া নয়, অনেক প্রশ্নপত্র পুরোপুরি ছাপা হয়নি। কোনো কোনো পৃষ্ঠার একটি অংশ ছাপা থাকলেও বাকি অংশ সম্পূর্ণ ফাঁকা ছিল। পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র নিয়ে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দ্রুত ফটোকপি করে দেওয়ার সুযোগ না থাকায় শিক্ষার্থীদের অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হয়, যার ফলে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু করা নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, পরীক্ষার আগে গোপনীয়তার খাতিরে প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলা হয় না। কিন্তু পরীক্ষার সময় প্যাকেট খুলতে গিয়েই এই ভয়াবহ ভুলগুলো ধরা পড়ে। এক প্রধান শিক্ষক জানান, দ্বিতীয় শ্রেণির তিনটি ইংরেজি প্রশ্ন কম ছিল এবং প্যাকেটের ভেতরে ভুল প্রশ্ন ছিল। অন্য এক শিক্ষক জানান, প্রথম শ্রেণির প্যাকেটের ভেতরে দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির প্যাকেটের ভেতর প্রথম শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্ন পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রথম শ্রেণির ইংরেজি প্রশ্নের সংখ্যাও একটি কম ছিল।

অন্য এক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, তার বিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্রের ঘাটতি না থাকলেও আশপাশের চার-পাঁচটি বিদ্যালয়ে একই ধরনের সমস্যা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, বিদ্যালয়গুলো নিজেরাই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে এবং প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে তা জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু ধামরাইয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রশ্নপত্র তৈরি ও সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছে। প্রথম টার্মিনাল পরীক্ষার সময়ও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

প্রশ্নপত্র তৈরির নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টিও এখন বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশ্ন তৈরির জন্য জনপ্রতি ১০ টাকা এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ১২ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। ধামরাইয়ের ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এই হিসাবে প্রশ্নপত্র তৈরির নামে কয়েক লাখ টাকা তোলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, উপজেলা শিক্ষা অফিস কেন এই দায়িত্ব নিল এবং এই বিপুল পরিমাণ অর্থের হিসাব কোথায়?

পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্নপত্র না পাওয়া বা ভুল প্রশ্ন পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থীকে প্রশ্নপত্রের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকতে হওয়ায় পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়েছে বলে শিক্ষক ও অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অভিভাবকরা বলছেন, শিশুদের মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এমন ভুল কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রশ্নপত্র কম থাকা, ভুল প্যাকেটে অন্য শ্রেণির প্রশ্ন থাকা কিংবা অসম্পূর্ণ প্রশ্ন সরবরাহের কারণে শিশুদেরই ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। তারা ঘটনার কারণ খুঁজে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এই পুরো বিষয়টি নিয়ে ধামরাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোবাখখারুল ইসলাম মিজান জানান, তিনি অভিযোগগুলো শুনেছেন এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন। তবে প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব ও অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তার কোনো সদুত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। অভিভাবক ও সচেতন মহল মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষার মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় এমন গাফিলতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

পরিশেষে, ধামরাইয়ের এই ঘটনাটি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ও মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা না করে যেভাবে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছে, তা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয়। আগামীতে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমিয়ে একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু পরীক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনাই এখন প্রধান দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *